বাংলাদেশে ঋণ পুনরুদ্ধার ও দেউলিয়া আইন একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও আইনি কাঠামো, যা ঋণদাতাদের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং ঋণগ্রহীতার ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে সহায়ক। দেউলিয়া আইন, ১৯৯৭ (Bankruptcy Act, 1997) এবং আর্থিক ঋণ আদালত আইন, ২০০৩ (Artha Rin Adalat Ain, 2003) এই প্রক্রিয়ার মূল ভিত্তি। বাংলাদেশে ব্যবসা ও ব্যক্তিগত ঋণপ্রাপ্তির হার বেড়েছে, যার ফলে ঋণদাতারা অনেক সময় ঋণ আদায় করতে গিয়ে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। ঠিক তখনই দেউলিয়া আইন ও ঋণ পুনরুদ্ধার আইন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে—ঋণগ্রহীতার সক্ষমতা, আদালতের রায়, এবং ঋণদাতার অধিকার নিশ্চিত করতে।
বাংলাদেশে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তিগত উদ্যোগের আর্থিক দুরবস্থা অনেক সময় দেউলিয়া অবস্থা সৃষ্টি করে। এ প্রেক্ষাপটে দেউলিয়া আইন এবং ঋণ পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া দুইটি গুরুত্বপূর্ণ আইনগত উপকরণ, যা ঋণদাতার অধিকার রক্ষা ও দেউলিয়া ব্যক্তির ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে।
⚖️ দেউলিয়া আইনের সংজ্ঞা ও প্রেক্ষাপট
- দেউলিয়া আইন (Bankruptcy Law) মূলত ব্যবসায়িক অথবা ব্যক্তিগত ঋণগ্রস্ততা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।
- বাংলাদেশে দেউলিয়া আইন, 1997 দেউলিয়াত্বের আনুষ্ঠানিক কাঠামো নির্ধারণ করে।
- আদালতের মাধ্যমে কোনও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে দেউলিয়া ঘোষণা করে তার সম্পদ ব্যবস্থাপনায় অভিভাবক নিয়োগ করা হয়।
ঋণ পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া
- ঋণ পুনরুদ্ধার মানে হচ্ছে—ঋণদাতাদের পক্ষ থেকে দাবিকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনার কার্যক্রম।
- এখানে ব্যবহৃত হয়:
- আদালতভিত্তিক মামলা (Artha Rin Suit, Money Suit, Certificate Case),
- Alternative Dispute Resolution (ADR),
- Arbitration বা সালিশি পদ্ধতি,
কাকে দেউলিয়া ঘোষণা করা যায়?
দেউলিয়া বিষয়ক আইন, ১৯৯৭ এর ধারা ২(৩৬) অনুযায়ী নিম্নোক্ত সত্ত্বাগুলোকে দেউলিয়া ঘোষণা করা যায়:
- একক ব্যক্তি (Natural Person)
- কোম্পানি বা কর্পোরেট সংস্থা
- অংশীদারী ব্যবসা
- সমিতি বা সংগঠন
কেস ল: Chaturbhuj Vs. Kewal Ram (1925) AIR Mad. 1249 — যৌথ হিন্দু পরিবারের সদস্যদের দেউলিয়া ঘোষণা সংক্রান্ত রায়।
কাকে দেউলিয়া ঘোষণা করা যায় না?
ধারা ১১(২) অনুযায়ী নিম্নোক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দেউলিয়া মামলা গ্রহণযোগ্য নয়:
- নাবালক
- উন্মাদ বা বিকৃত মস্তিষ্কসম্পন্ন ব্যক্তি
- মৃত ব্যক্তি
- সরকারী সংস্থা, ধর্মীয় বা দাতব্য প্রতিষ্ঠান
- স্বশাসিত প্রতিষ্ঠান (সরকারি অর্থায়নে প্রতিষ্ঠিত)
কেস ল: Shivagouda Ravji Patil Vs. Chandrakant (1965) AIR SC 212 — অংশীদারী কারবারে নাবালক অংশীদারকে দেউলিয়া ঘোষণা করা যায় না। KM Akhtaruzzaman vs. Agrani Bank (57 DLR 2005)– গ্যারান্টার “debtor” নয়, তাই দেউলিয়া ঘোষণা অগ্রহণযোগ্য।
⚙️ ঋণ মোকদ্দমা থাকলে দেউলিয়া মামলায় সুবিধা কী?
দেউলিয়া মামলা দায়েরের মাধ্যমে পাওনাদার নিম্নোক্ত সুবিধা পেতে পারেন:
- আর্জি পেশের মাধ্যমে দেনাদারের সম্পত্তি ক্রোকের সুযোগ (ধারা ২৪)
- রিসিভার নিয়োগ করে সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা ও বিক্রয় (ধারা ২৩)
- বণ্টনযোগ্য সম্পদ থেকে পাওনা আদায়ের সুযোগ (ধারা ৩১)
- দেনাদারের বিরুদ্ধে অন্তর্বর্তী কার্যধারা গ্রহণ (ধারা ২৪)
❌ দেউলিয়া হলে একজন ব্যক্তি কী ধরনের অসুবিধায় পড়তে পারেন?
দেউলিয়া ঘোষিত হলে ব্যক্তির উপর বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ হয়:
- পাসপোর্ট জব্দ বা বাতিল (সংশোধনী প্রস্তাব, ২০২৩)
- বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা
- ক্লাব সদস্যপদ, কোম্পানির পরিচালক পদে অযোগ্যতা
- একাধিক ব্যাংক হিসাব পরিচালনায় বিধিনিষেধ
একজন দেউলিয়া হলে ঋণ কিভাবে সমন্বয় হয়?
দেউলিয়া ঘোষণার পর নিম্নোক্ত প্রক্রিয়ায় ঋণ সমন্বয় হয়:
- রিসিভার দেনাদারের সম্পদ বিক্রি করে পাওনাদারদের মধ্যে বণ্টন করেন
- ধারা ৩৯ অনুযায়ী দায়মুক্তি আদেশ পেলে দেনাদার পূর্ববর্তী দেনা থেকে অব্যাহতি পান
- ধারা ৪৩ ও ৪৬ অনুযায়ী আপোষ মীমাংসা বা পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঋণ পুনঃনির্ধারণ হয়
দেউলিয়া মামলা কতদিনে নিষ্পত্তি হয়?
বর্তমান আইনে সময়সীমা নির্ধারিত নয়, ফলে মামলা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। সংশোধনীতে সময়সীমা নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে।
দেউলিয়া মামলা চলাকালে দেনাদার মারা গেলে কী হয়?
ধারা ২০ অনুযায়ী, দেনাদারের মৃত্যুর পরও কার্যধারা অব্যাহত রাখা যায় এবং রিসিভার সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা করেন।
উপসংহার
বাংলাদেশে দেউলিয়া আইন একটি গুরুত্বপূর্ণ অথচ অবহেলিত ক্ষেত্র। ঋণ পুনরুদ্ধার, আর্থিক শৃঙ্খলা, এবং কর্পোরেট সুশাসন নিশ্চিত করতে এই আইনের কার্যকর প্রয়োগ জরুরি। সংশোধনী ও সময়োপযোগী বিধান সংযোজনের মাধ্যমে দেউলিয়া আইনকে আরও কার্যকর ও মানবিক করা সম্ভব।




